ভারতীয় গণতন্ত্র এবং গণমাধ্যমের বিপদময় অবস্থা

গণমাধ্যমকে বলা হয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ।  গণমাধ্যম সর্বদাই গণ অর্থাৎ জনগণের কথা বলে থাকে। সুতরাং সভ্যতার আদিকাল থেকেই গণমাধ্যমের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা কম হয়নি। কারণ  যে সকল ব্যক্তি বা সংস্থা সাধারণ মানুষের উপর তাদের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতেন তারা এটাকে কখনো সু-দৃষ্টিতে দেখেনি যে গণমাধ্যম এর মাধ্যমে জনগণ সঠিক বিষয়টিকে জানতে অথবা বুঝতে শিখবে। ফলে গণমাধ্যমের উপর তাদের এই নিয়ন্ত্রণ রাখার চেষ্টা কখনো কখনো হয়েছে সম্ভব আবার কখনো কখনো বল প্রয়োগের মাধ্যমে অথবা অর্থের বিনিময় তাকে করা হয়েছে সম্ভব।
কিন্তু তার মানে এই নয় গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ এই গণমাধ্যম গুলির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণরূপে অভিজাত শ্রেণী অথবা ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বা সংস্থার মুষ্টির মধ্যে আবদ্ধ। সংখ্যায় নিতান্ত কম হলেও তাদের মধ্যে এখনো অনেকেই জনগণের কথা বলে থাকে। তবে ভারতবর্ষের বর্তমান পরিস্থিতির উপর দৃষ্টিপাত করলে লক্ষ্য করা যায় বিগত কয়েক দশক ধরে গণমাধ্যম গুলির উপর নিয়ন্ত্রণ ফলানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েক গুণ এবং তার চরম সীমায় পৌঁছেছে গত 5 বছর ধরে। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ভারতবর্ষের শতকরা 90 ভাগ সর্বভারতীয় গণমাধ্যমগুলি অর্থাৎ টিভি চ্যানেল অথবা সংবাদপত্র গুলির নিয়ন্ত্রণ কোন একটি নির্দিষ্ট মতামত দ্বারা প্রভাবিত ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টি হাতের মধ্যে। এই ধরনের ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টি যখন রাজ ধর্ম মেনে চলা কিন্তু সংখ্যায় খুবই কম গণমাধ্যম এর একটি নির্দিষ্ট অংশকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না তখনই সেই সমস্ত স্বল্প সংখ্যক গণমাধ্যম গুলির উপর চলে নানা ধরনের চাপ অথবা হুমকি। কখনো কখনো এই চাপ হয়ে দাঁড়ায় উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে প্রশাসনের ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে অথবা তাদের ব্রডকাস্টিং লাইসেন্স বাতিল করার মাধ্যমে। কিন্তু যারা বা যে সমস্ত গণমাধ্যম গুলি এই ক্ষমতাসীনদের চাপের কাছে মাথা নত না করে নিজেদের দায়িত্ব কে সঠিকভাবে পালন করে যায় ঠিক তখনই তাদেরকে ঘোষিত করে দেওয়া হয় দেশদ্রোহী কিংবা সন্ত্রাসবাদির তকমা। কোন কোন ক্ষেত্রে এই সমস্ত গণমাধ্যমগুলোর সঙ্গে জড়িত সাংবাদিকদের সহ তাদের পরিবার সদস্যদের পর্যন্ত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়ে থাকে। যখন এই সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় ঠিক তখনই তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে জনগণের সামনে উন্মোচন করে দেওয়া হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে যে সমস্ত সাংবাদিক ক্ষমতাসীন অথবা চলমান সরকারের জনবিরোধী প্রকল্প বা মতামত এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন অথবা প্রাইম টাইমে সেই সংবাদ কে স্থান দিয়েছেন ঠিক তখনই মোবাইল নম্বরে ভেসে এসেছে অকথ্য গালাগালি অথবা হুমকি। কখনো কখনো কেড়ে নেওয়া হয় তাদের চাকরি টুকুও। বর্তমান ভারতবর্ষ যাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তাদের পরিস্থিতি ঠিক যেন সেই উলঙ্গ রাজার মতো অর্থাৎ তাদের পরিধানে কোন বস্ত্র নেই এই কথাটি বলার সাহস নেই 90% গনমাধ্যমের। কিন্তু উলঙ্গ রাজা কবিতার সেই ছোট বাচ্চাটির মত স্বল্পসংখ্যক গণমাধ্যম গুলি যখন এই সমস্ত মানুষগুলোর মুখের মুখোশ খুলে দেওয়ার মাধ্যমে জনগণের উপর থাকা নিজেদের অলিখিত দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করতে সচেষ্ট হয় ঠিক তখনই তাদেরকে পড়তে হয় নানা বিধ লাঞ্ছনা ও বঞ্চনার মধ্যে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বিগত কয়েক বছর ধরে সাংবাদিকদের হত্যার হার বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ। আর এই সমস্ত সাংবাদিকদের জীবন দাস এর দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় তাদের মধ্যে বেশির ভাগ ব্যক্তিই বেঁচে থাকাকালীন ক্ষমতাসীন কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তি সমষ্টি অথবা ক্ষমতাসীন সরকারের জনবিরোধী প্রকল্পের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সুতরাং গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ যারা জনগণের সুবিধা ও অসুবিধার কথা বলে থাকেন এবং জনগণের নিরাপত্তা কে সুনিশ্চিত করতে সহায়তা করেন সেই গণমাধ্যম অথবা তার সঙ্গে জড়িত সকল মানুষই আজ কোথাও না কোথাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাদের এই নিরাপত্তাহীনতার চরম পরিণতি কি হবে তা ভবিষ্যতই বলবে!

ধন্যবাদ।

লেখক:-সুরাজ
তারিখ:-২৩/০২/২০১৯

Comments